কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের প্রায় ৮০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দুই ইউনিয়নের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয়ভাবে পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে পানিবন্দি মানুষ আশ্রয় নিতে পারেন, সে জন্য বিদ্যালয় ভবনগুলো খোলা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত হয়ে বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি, কৃষি অফিস ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে পদ্মা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে।
স্থানীয়দের দাবি, ভারতের ফারাক্কা বাঁধ খুলে দেওয়ার পর উজানের পানি ও বৃষ্টির পানি একসঙ্গে নেমে আসায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।

রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল জানান, তার ইউনিয়নে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। স্কুলগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে গেছে। যেসব বাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে, সেসব পরিবারের সদস্যদের নৌকার মাধ্যমে তুলনামূলক নিরাপদ ও উঁচু এলাকায় নেওয়া হচ্ছে। ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মানুষের চলাচলের প্রধান অবলম্বন এখন ডিঙি ও ছোট নৌকা। বেশ কিছু বাড়িঘর সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে এবং অধিকাংশ বাড়ির চারপাশে পানি উঠেছে।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মান্নান উদ্দিন বলেন, ১৯টি গ্রামের মধ্যে ১৭টি গ্রামের নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে। এতে তার ইউনিয়নের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এরই মধ্যে ইউনিয়নের প্রায় সব রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে পুরো ইউনিয়নের মানুষ অনেকটা পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। ইউনিয়নের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ রাখা হয়েছে। পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী এক দিনের মধ্যে আরও অনেক বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করতে পারে। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
তিনি জানান, গত বুধবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, উজানের ঢল ও অতিরিক্ত বৃষ্টিই নদীর পানি বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এক সপ্তাহে নদীর পানি প্রায় ৮৮ সেন্টিমিটার বেড়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপৎসীমার প্রায় ৯২ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় আগামী কয়েক দিনে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে কৃষি অফিস সূত্র জানায়, দুই ইউনিয়নে প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। এসব জমিতে থাকা আমন ধান, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি আরও বাড়লে কৃষি খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পানিবন্দি মানুষের মধ্যে বিশুদ্ধ খাবার পানি, শুকনো খাবার ও গো-খাদ্যের সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন দুর্গত এলাকার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে। পাশাপাশি পানিবন্দি মানুষের মধ্যে বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মুশতাক আহমেদ ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফারুক আহমেদ বলেন, চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রাস্তাঘাটও ডুবে গেছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসা বন্ধ রেখেছেন। তবে বিদ্যালয়ে সরাসরি পাঠদান বন্ধ থাকলেও শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসাউদ্দৌলা বলেন, উজান থেকে নেমে আসা পানি ও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পদ্মার পানি বেড়েছে। প্রতিবছরই দৌলতপুরের রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। বর্তমানে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। নদীর পানি বর্তমানে ১৩ মিটারের আশপাশে রয়েছে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।