বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ০৮:৫৭ অপরাহ্ন

ভুয়া রপ্তানি আদেশে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১০,৫০০ কোটি টাকা পাচার

কুষ্টিয়া পোস্ট ডেস্কঃ / ৫৮ জন পড়েছেন
প্রকাশঃ বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ৭:০৯ পূর্বাহ্ন

প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার মাধ্যমে রপ্তানি আদেশের অঙ্ক বাড়িয়ে দেখিয়ে প্রায় ১০,৪৫৫.৯৫ কোটি টাকা (৯৬৮.১৪ মিলিয়ন ডলার) বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ব্যাংকের তৎকালীন কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এই বিশাল অঙ্কের অর্থ জালিয়াতি করা হয় বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে।

তদন্তে দেখা গেছে, ওই শাখার ২৯ জন গ্রাহক তাদের রপ্তানি আদেশের তুলনায় ১০০% থেকে ৩৭৫% পর্যন্ত বেশি মূল্যের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলেছিলেন। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, প্রকৃত রপ্তানি আয়ের সর্বোচ্চ ৮০% পর্যন্ত এলসি খোলার সুযোগ থাকলেও তারা সেই সীমার তোয়াক্কা করেননি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এর ফলে গ্রাহকরা ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত অর্থায়ন সুবিধা গ্রহণ করে প্রায় ৯৬৮.১৪ মিলিয়ন ডলার (১০,৪৫৫.৯৫ কোটি টাকা) পাচার করেছেন।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ওই এলসিগুলোর বিপরীতে আমদানি করা কাঁচামাল রপ্তানি কাজে ব্যবহারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, এসব কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ওই শাখার লেনদেন বিশ্লেষণ করে তদন্ত দল দেখেছে, ব্যাংকের কর্মকর্তারা যথাযথ নিয়ম (ডিউ ডিলিজেন্স) লঙ্ঘন করে গ্রাহকদের এই কাজে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন।এমনকি তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও এসব তথ্য জানাননি।

অডিট রিপোর্টে আরও জানা গেছে, শুল্ক প্রত্যর্পণ (ডিউটি ড্র ব্যাক) এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে ওই ২৯টি কোম্পানি রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।

একজন শীর্ষ স্থানীয় রপ্তানিকারক, যার দুটি প্রতিষ্ঠান ওই অভিযুক্ত তালিকায় রয়েছে, অভিযোগ করেছেন যে অনেক রপ্তানিকারক জানতেনই না তাদের নামে রপ্তানি এলসি খোলা হয়েছে। ব্যাংকের কর্মকর্তারা রপ্তানি আয়ের অর্থ আটকে রেখে তাদের দিয়ে ভুয়া নথিতে সই করিয়ে নিতেন।

২০২৩ সালে এই তদন্ত প্রতিবেদন সম্পন্ন হলেও ব্যবস্থা নিতে তিন বছর দেরি করা হয়। সবশেষ চলতি বছরের মার্চ মাসে ওই শাখার অথরাইজড ডিলার (এডি) লাইসেন্স বাতিল করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপের কারণে এই দীর্ঘ বিলম্ব হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা বলছেন, বেশিরভাগ বাণিজ্য অর্থায়ন জালিয়াতি হয় ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি এবং রপ্তানি আদেশের মাধ্যমে। তাদের মতে, শুধু শাখা নয়, ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকেও এই অপরাধের দায় নিতে হবে।

পরিসংখ্যান যা বলছে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘টোটাল ফ্যাশন’ ৩৬৪ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আদেশের বিপরীতে ২৩১ মিলিয়ন ডলারের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলে। কিন্তু তাদের প্রকৃত রপ্তানি ছিল মাত্র ৬২ মিলিয়ন ডলার।

‘আভান্তি কালার টেক্স’ ২৯০ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আদেশের বিপরীতে ১৪৬ মিলিয়ন ডলারের এলসি খুলেছিল, যেখানে তাদের প্রকৃত রপ্তানি ছিল মাত্র ৬৭ মিলিয়ন ডলার। ‘ডোয়াস-ল্যান্ড অ্যাপারেলস’ মাত্র ৫৫.৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করলেও ২০৮ মিলিয়ন ডলারের এলসি খুলেছিল।

এছাড়া ‘অহনা নিট কম্পোজিট’ মাত্র ১৩.৫ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি করলেও ৯৯ মিলিয়ন ডলারের এলসি খোলে। ‘এইচকে অ্যাপারেলস’ ৬০.৮৫ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি করে ১২৬ মিলিয়ন ডলারের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আরও ২৪টি কোম্পানির ক্ষেত্রে একই ধরনের জালিয়াতি খুঁজে পেয়েছে, যেখানে এলসি খোলার পরিমাণ প্রকৃত রপ্তানির চেয়ে অনেক বেশি ছিল।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা
ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে রপ্তানির কাঁচামাল কেনার জন্য রপ্তানি এলসির বিপরীতে ব্যাংক অর্থায়ন করে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব এলসির মাধ্যমে আসা কাঁচামাল রপ্তানি শিল্পে ব্যবহারের কোনো চিহ্ন নেই। বরং বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও শুল্ক সুবিধার আওতায় আনা এসব পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বছরের পর বছর ধরে এই অপরাধে সহায়তা করেছে। কোনো ক্ষেত্রেই ব্যাংক শাখা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে কোনো তথ্য জানানো হয়নি।’

তদন্তে দেখা গেছে, একই গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে রপ্তানি আদেশ ও এলসির বিপরীতে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অভিযোগ করেছে, শাখা কর্মকর্তারা যোগসাজশ করে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই এসব লেনদেন সম্পন্ন করেছেন।

১০ বছর ধরে শাখা ব্যবস্থাপক
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জালিয়াতির ওই সময়ে মো. শহীদ হাসান মল্লিক প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক ছিলেন। ব্যাংকিং নিয়ম লঙ্ঘন করে তিনি একই শাখায় টানা ১০ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া আরও ২৪ জন কর্মকর্তা নিয়ম ভেঙে দীর্ঘসময় সেখানে কর্মরত ছিলেন।

বারবার চেষ্টা করেও এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য মল্লিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনজুর মফিজ বলেন, তিনি গত ১৬ এপ্রিল দায়িত্ব নিয়েছেন এবং অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা না করে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না।

তিনি জানান, বর্তমানে প্রধান কার্যালয়সহ কয়েকটি শাখায় ফরেনসিক অডিট চলছে এবং নারায়ণগঞ্জ শাখার জন্য আলাদা একটি ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিপোর্ট প্রসঙ্গে মফিজ বলেন, ‘শাখা ব্যবস্থাপকসহ সংশ্লিষ্টদের বরখাস্ত করা হয়েছে এবং বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) জানানো হয়েছে। বর্তমানে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব কেন?
২০২৩ সালের মে মাসে যখন বাংলাদেশ ব্যাংক এই তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করে, তখন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এইচবিএম ইকবাল।

প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ছিল ইকবাল পরিবারের হাতে। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এইচবিএম ইকবাল চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ব্যাংকটির পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করেন।

তদন্ত প্রতিবেদনের প্রায় তিন বছর পর চলতি বছরের মার্চ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই শাখার লাইসেন্স বাতিল করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আগে রিপোর্ট তৈরি হলেও তৎকালীন প্রভাবশালী মহলের চাপে তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, এডি লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে এবং দেরি হলেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘তৎকালীন চেয়ারম্যানের প্রভাবের কারণেই ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।’

‘রপ্তানিকারকরা এলসি সম্পর্কে জানতেনই না’
অভিযুক্ত ২৯টি কোম্পানির মধ্যে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠানের নামও রয়েছে।

হাতেম জানান, প্রিমিয়ার ব্যাংকের এই জালিয়াতি নিয়ে তদন্তের জন্য তারা বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ করেছিলেন।

তিনি দাবি করেন, ব্যাংকের সঙ্গে যোগসাজশ করেই এই অনিয়ম হয়েছে। ‘আমরা জেনেছি যে প্রকৃত রপ্তানির চেয়ে অনেক বেশি অঙ্কের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়েছে।’

হাতেম আরও অভিযোগ করেন, ব্যাংক সব নথি রপ্তানিকারকদের দিত না, বরং দায় চাপিয়ে দিত। ‘নথি চাইলে তারা দিত না, উল্টো পেমেন্ট আটকে রাখার ভয় দেখিয়ে আমাদের স্বাক্ষর করতে বাধ্য করত।’

তিনি বলেন, ‘আমরা জানি না কীভাবে এই দায়গুলো তৈরি হলো। ভুয়া রপ্তানি আদেশ ব্যবহার করে ব্যাংক ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খুলেছে এবং রপ্তানিকারকদের ভয় দেখিয়ে স্বাক্ষর নিয়েছে।’

এই শিল্প নেতা দাবি করেন, অনেক গার্মেন্টস রপ্তানিকারক হয়ত জানেনই না যে তাদের নামে এমন এলসি খোলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তারা আগামী সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলন করবেন।

শুধু লাইসেন্স বাতিলই যথেষ্ট নয়
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব বলেন, নগদ প্রণোদনা বা ভর্তুকি পাওয়ার লোভেই এই অনিয়মগুলো হয়ে থাকতে পারে।

তিনি বলেন, ‘প্রণোদনা দাবি করা হলেও বাস্তবে কোনো রপ্তানি হয়নি। বেশিরভাগ বাণিজ্য জালিয়াতি ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমেই হয়। তাই শুধু লাইসেন্স বাতিল করা সমাধান নয়।’

তিনি পরামর্শ দেন, ওই সময়ের পরিচালনা পর্ষদ এবং উচ্চতর ব্যবস্থাপনার সদস্যদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং এই লেনদেনের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আরও নিবিড় নজরদারি করতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর ....
Theme Created By ThemesDealer.Com