মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৯ পূর্বাহ্ন

কুষ্টিয়ায় ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ৯০ শিশু

কুষ্টিয়া প্রতিনিধিঃ / ৮১ জন পড়েছেন
প্রকাশঃ বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৫৪ অপরাহ্ন

কু‌ষ্টিয়া জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘন্টায় ভ‌র্তি হ‌য়ে‌ছে ৯০ জন শিশু। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ ) পর্যন্ত ভ‌র্তি হওয়া এসব শিশু জেলার পাচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এছাড়া চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৮৮ দিনে জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬৩জন শিশু ভর্তি হয়েছে। তবে কোন শিশু মারা যায়নি। কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার নাসরিন আক্তার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জানা গে‌ছে, ৯০ শতাংশ শিশুর বয়স ৬মাস থেকে এক বছরের মধ্যে। জেলার ছয়টি উপজেলার মধ্যে কুমারখালী ও দৌলতপুর উপজেলা হামের উপসর্গের রোগীদের হটস্পট। ভর্তি হওয়া রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে এপর্যন্ত ১১টি পজেটিভ রোগী পাওয়া গেছে। প্রথম রোগী এসেছিল ঢাকা থেকে।
গত রোববার খুলনা বিভাগীয় পরিচালক(স্বাস্থ্য) ভারপ্রাপ্ত মজিবুর রহমান কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করেন— কুষ্টিয়ায় জেলায় প্রতি ১০ লক্ষ জনগণের মধ্যে ২০২৪ সালে গড়ে ৫জন, ২০২৫ সালে ৩জন ও ২০২৬ সালে এই তিন মাসে গড়ে ১৫জন হাম রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এবং তাদের অধিকাংশ রোগীর বয়স ৫ বছরের নিচে। এবং যাদের অধিকাংশ হাম-রুবেলা টিকা পায়নি।জ্বর ও শরীরে লালচে দানা লক্ষণ যুক্ত সকল রোগীকে সন্দেহজনক হাম রোগী হিসাবে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত তিন সপ্তাহ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু রোগীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫জন রোগী ভর্তি হচ্ছে। বর্তমানে ১৯ জন রোগী ভর্তি আছে।
হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের ২০ শয‌্যার শিশু ওয়ার্ডে শতাধিক রোগীতে ঠাসা। ওয়ার্ডের কক্ষ পূর্ণ হয়ে বারান্দায় রাখা হয়েছে শিশু রোগীদের। হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের আলাদাভাবে দোতলার একটি ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। সেখানেও বিছানার ঘাটতি। কয়েকটি বিছানায় দুজন করে শিশু রাখা হয়েছে। অধিকাংশ শিশুই জ্বর, ঠান্ডা, কাশি ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত। শরীরে ফোটা ফোটা র‌্যাশও রয়েছে। শিশু সন্তানদের কোলে নিয়ে বসে আছেন তাদের মায়েরা ও স্বজনেরা।
ত‌বে অভিযোগ র‌য়ে‌ছে— হাসপাতাল থে‌কে কোন প্রকার ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি সিরিঞ্জসহ অক্সি‌জেন দেওয়ার পানি ও নল যাবতীয় সব কিছু বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। সারা‌দি‌নে একবার চিকিৎসকরা রাউন্ডে আসেন।
হামে আক্রান্ত তিন মাস বয়সী মেয়ে ফারিয়া খাতুনকে নি‌য়ে হাসপাতা‌লের বিছানায় বসে ছিলেন মা মিতু খাতুন। তার বাড়ি সদর উপজেলার ঝাউদিয়া গ্রামে। শনিবার মে‌য়ে‌কে হাসপাতা‌লে ভর্তি করান। তিনি জানান— তার নি‌জেরও ঠান্ডা জ্বর ছিল। এরপর মেয়ের প্রচন্ড জ্বর আসে। গায়ে র‌্যাশ দেখা দেয় প্রচুর। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল। বেসরকারিভাবে এক চিকিৎসককে দেখানো পর তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করা হয়। এখন শ্বাসকষ্ট কমেছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘হাসপাতাল কোনো প্রকার ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি সিরিঞ্জসহ অক্সিজেন দেওয়ার পানি ও নল যাবতীয় সব কিছু বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় সাড়ে বার’শ টাকা খরচ হচ্ছে। জ্ব‌রের সিরাপ পর্যন্ত বাইরে থেকে কেনা লাগছে। ২৪ ঘন্টায় একবার শুধু বেলা এগারটার দিকে ডাক্তার আসছে।’
একই অভিযোগ সদর উপজেলার আলামপুর গ্রাম থেকে আসা নাজনীন আক্তারের। তার তিন মাস বয়সী সন্তান ওরহানকে নিয়ে তিনদিন আগে ভর্তি হন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে ছেলের জ্বর হয়। চারদিন ছিল। এরপর সারা শরীরে ছোট ছোট র‌্যাশে ভরে যায়। পরে হাসপাতালে আনছি। এখন কিছুটা ভালো আছে।’ তিনিও ২৪ঘন্টায় একজন চিকিৎসক শুধু সকাল বেলায় আসে বলে অভিযোগ করেন।
কুমারখালী থেকে আয়ান নামে এক শিশুকে নিয়ে চারদিন আগে ভর্তি করিয়েছেন মা অন্তরা খাতুন। তিনি বলেন, ‘একটা সিরিঞ্জও দেয় না। সব ওষুধ বাইরে থেকে কেনা লাগছে। এমনকি ফার্মেসীতেও পেতে বেগ পেতে হচ্ছে।’
জানতে চাইলে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ওয়ার্ডে দায়িত্বরত নার্স কামরুন্নাহার বলেন, ‘পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। স্টোরকক্ষের কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে। কোনো কিছু পাওয়া যাচ্ছে না।’
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমাম বলেন, ‘হামে আক্রান্ত রোগী ১৯ জন ভর্তি আছে। তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে অক্সি‌জেন সার্পোট রয়েছে। তবে কোনো ভেন্টিলেশন সাপোর্ট নাই। তিনজন রোগী একটু গুরুতর আছে। তিনজন চিকিৎসক ও তিনজন নার্সের তত্বাবধানে রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।’
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের বাইরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও হামে আক্রান্ত রোগী আসছে। এসব হাসপাতালেও হামে আক্রান্ত রোগীদের জন্য পৃথক ‘হাম আইসোলেশন কর্নার’ খোলা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে জেলায় ১৫জন রোগী ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে দুজন পজেটিভ। ফেব্রুয়ারি মাসে ২০জন ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে পজেটিভ ছিল ২জন। মার্চ মাসের ২৯ দিনে রোগী ভর্তি হয় ১২৮জন। তাদের মধ্যে ১১জন পজেটিভ রোগী। মোট পনের রোগী পজেটিভ সনাক্ত হয়। আর গত ২৪ঘন্টায় ভর্তি ৯০জন শিশু।
কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্ম কামাল হোসেন বলেন, ‘জেনারেল হাসপাতালের বাইরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে আক্রান্ত শিশু আসছে। রোগী বাড়তির দিকে যাচ্ছে। সব হাসপাতালে পৃথক ‘হাম আইসোলেশন কর্নার’ করা হয়েছে। হামে আক্রান্ত শিশুদের বিশেষ নজরদারিতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসকের সাথে সভা করে আরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর ....
Theme Created By ThemesDealer.Com